অভিনয়ের ধ্রুবতারা হুমায়ুন ফরীদি: এক মৃত্যুঞ্জয়ী নক্ষত্রের প্রয়াণ দিবস

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। ফাল্গুনের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সাজছিল, ঠিক তখনই ভক্তদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান অভিনয়ে জগতের কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরীদি। আজ তার প্রয়াণ দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আজও বেঁচে আছেন দর্শক, ভক্ত আর শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ে। কখনো নায়ক, কখনো খলনায়ক—কারো কাছে তিনি আদর্শ, কারো কাছে অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ উপমা।
জীবদ্দশায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে মঞ্চ, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে সমান দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে রঙ ছড়িয়েছেন বরেণ্য এই অভিনেতা। হতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়ী, কিন্তু নিয়তি তাকে তৈরি করেছিল দেশসেরা অভিনেতা হওয়ার জন্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের পরামর্শে যোগ দেন ঢাকা থিয়েটারে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক কালজয়ী অধ্যায়। ‘কীর্তনখোলা’ কিংবা ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’র মতো নাটকে তার অভিনয় আজও মঞ্চপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে।
টেলিভিশনে আতিকুল হক চৌধুরীর ‘নিখোঁজ সংবাদ’ দিয়ে অভিষেক ঘটলেও হুমায়ূন আহমেদের ‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় তার পদচারণা ছিল আরও বিস্ময়কর। তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ দিয়ে শুরু করে ‘সন্ত্রাস’, ‘ভণ্ড’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘একাত্তরের যীশু’ ও ‘বিশ্বপ্রেমিক’র মতো অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমায় তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রের জন্য পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
মৃত্যু নিয়ে হুমায়ুন ফরীদির দর্শন ছিল অত্যন্ত গভীর ও আধ্যাত্মিক। তিনি বলতেন, “মৃত্যুর মতো এত স্নিগ্ধ, এত গভীর সুন্দর আর কিছু নেই। কারণ মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু মানে অস্তিত্বের বিলীন হয়ে যাওয়া নয়।” তার বিশ্বাস ছিল, মানুষ তার সৃষ্টি ও কর্ম দিয়ে অস্তিত্বকে যুগ যুগ ধরে কালোত্তীর্ণ করে রাখে। তিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুকে জয় করতে নয়, বরং কর্ম দিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী হতে। আজ তার সেই বিশ্বাসই বাস্তব সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে।
ব্যক্তি জীবনে রোমান্টিক এই মানুষটি ভালোবাসাকে দেখতেন বিশালতার মাপকাঠিতে। তিনি বলতেন, “তুমি যখন কাউকে ভালোবাসবে এক বুক সমুদ্র নিয়ে তাকে ভালোবাসবে।” ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার ব্যক্তিজীবন ছিল সাদামাটা, যদিও সেখানে বিচ্ছেদের সুর ছিল। ২০০৮ সালে সুবর্ণা মুস্তফার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০১২ সাল পর্যন্ত একাকী জীবনযাপন করেছেন তিনি। ২০১৬ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।
অভিনয় জীবনের দ্যুতি ছড়িয়ে ২০১২ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে চলে গেলেও, বাংলাদেশের মানুষের অঢেল ভালোবাসায় আজও স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম—হুমায়ুন ফরীদি। তার প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা।

















