রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেট পেশের আগে উত্তপ্ত হয়ে উঠল বিধানসভার কক্ষ। একদিকে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ও উন্নয়নের খতিয়ান, অন্যদিকে অনুপ্রবেশ ও ডেমোগ্রাফি বদলের অভিযোগ— এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে নজিরবিহীন বাগযুদ্ধে জড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, “জেনে রাখুন, আগামীতে অনেক সিট হারাবেন।”
বৃহস্পতিবার রাজ্যপালের ভাষণের ওপর ধন্যবাদজ্ঞাপন পর্বে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় সাহায্যের প্রসঙ্গ তুললে মমতা পাল্টায় বলেন, “কী ২ লাখ দেখাচ্ছেন? উত্তরবঙ্গে যখন মানুষ মারা গিয়েছিল, তখন টাকা দেননি। বাংলা দখলের কথা ভাববেন না, দিল্লি নিয়েই নাজেহাল অবস্থা আপনাদের। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের কী অবস্থা দেখা যাচ্ছে। তাই আপনারা জিরো ছিলেন, জিরো আছেন, জিরোই থাকবেন।”
বাজেট অধিবেশনের আবহেই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে কেন্দ্র টাকা না দিলেও রাজ্য দমে নেই। তিনি বলেন, “বাংলার উন্নয়ন নিয়ে আমরা গর্বিত। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য ১৫ বছর অপেক্ষা করেছি। শেষ পর্যন্ত আমরাই দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেছি।” কেন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত প্রকল্প (১০০ দিনের কাজ) বন্ধ করে দিয়েছে বলেও তিনি ক্ষোভ উগরে দেন।
অধিবেশনে অনুপ্রবেশ ইস্যু তোলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব ৮ বার জমি চেয়ে চিঠি দিলেও রাজ্য অসহযোগিতা করেছে। এর জবাবে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে বলেন, “জাতীয় গ্রন্থাগারে পেগাসাস লাগিয়েছেন, আর এখন অনুপ্রবেশের কথা বলছেন? একটা রোহিঙ্গা খুঁজে পেয়েছেন? ২০২৪-এর ভোটার লিস্টে যদি ভোট হয়ে থাকে, তবে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলুন।”
এদিন রাজ্যপাল সি.ভি. আনন্দ বোস তাঁর ভাষণ অত্যন্ত সংক্ষেপে (মাত্র সাড়ে চার মিনিটে) শেষ করেন। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় বিরোধী অংশগুলো পড়তে চাননি বলেই মাঝপথে ভাষণ থামিয়ে দিয়েছেন। ভাষণ শেষে বিজেপি বিধায়করা রাজ্যপালকে ‘ওয়েল ডান’ বলে অভিবাদন জানান। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে সৌজন্যবশত গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসেন।
এদিন এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উত্তপ্ত হয় বিধানসভা। বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ ভোটার বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাল্টা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বিষয়টি বিচারাধীন হওয়ায় এ নিয়ে বিশদ আলোচনা সম্ভব নয়।
বাজেট পেশের আগে বিধানসভার এই রণংদেহি মেজাজ স্পষ্ট করে দিল যে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসক ও বিরোধী— উভয় পক্ষই এখন থেকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ।