অধর্মের বিনাশে যখন খড়গ হাতে নামবেন স্বয়ং ঈশ্বর!

সনাতন ধর্মতত্ত্ব ও মহাজাগতিক কালচক্রের অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী, সৃষ্টির যেমন আদি আছে, তেমনি এর বিনাশও সুনিশ্চিত। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ—বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণুপুড়াণ এবং কল্কি পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, বর্তমান কলিযুগের অন্তিমলগ্নে পৃথিবী এক ভয়াবহ নৈতিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। যখন অধর্মের অন্ধকার মর্ত্যলোককে সম্পূর্ণ গ্রাস করবে, তখন কোনো সাধারণ দেব-দেবী নন, বরং স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু তাঁর চূড়ান্ত ও দশম অবতার ‘কল্কি’ রূপে অবতীর্ণ হবেন। তাঁর এই আগমনের মূল লক্ষ্য হবে খড়গ হাতে অধর্মের বিনাশ এবং ধরণীতে পুনরায় ‘সত্যযুগ’-এর পবিত্র ভিত্তি স্থাপন করা।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের (১২.২) বর্ণনা অনুযায়ী, কলিযুগের শেষলগ্নে মানুষের বিবেক ও আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পূর্ণ লোপ পাবে। শাস্ত্র বলছে, সেই সময় মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে কেবল তার অর্জিত সম্পদের ওপর ভিত্তি করে। পবিত্র পারিবারিক বন্ধন ও বিবাহ প্রথা কেবল শারীরিক আকর্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে। মানুষের শারীরিক উচ্চতা ও আয়ু নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে; গড় আয়ু নেমে আসবে মাত্র ২০ থেকে ৩০ বছরে। শাসকরা প্রজার রক্ষক হওয়ার পরিবর্তে শোষকে পরিণত হবে। যখন সমাজ থেকে দয়া, সত্য ও পবিত্রতা বিলুপ্ত হবে, তখনই মহাকালের চাকা ঘুরে যাবে এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসের দিকে।
কল্কি পুরাণের তথ্যমতে, উত্তর ভারতের ‘শম্ভল’ নামক এক পবিত্র গ্রামে বিষ্ণুযশা নামক এক শুদ্ধাত্মা ব্রাহ্মণের গৃহে কল্কি অবতারের জন্ম হবে। তিনি হবেন অসীম তেজোদীপ্ত এবং শৌর্য-বীর্যে অতুলনীয়। মহাদেব শিবের কাছ থেকে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করে তিনি এক দিব্য শ্বেত ঘোড়ায় (দেবদত্ত) চড়ে বিশ্বভ্রমণে বের হবেন। তাঁর হাতে থাকবে প্রদীপ্ত খড়গ, যা জ্ঞান ও সত্যের প্রতীক। এই খড়গের আঘাতেই তিনি মর্ত্যের সমস্ত অধর্ম ও পাপাচার নির্মূল করবেন। তাঁর এই যুদ্ধ মূলত কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি হবে সত্যের সাথে মিথ্যার চিরন্তন লড়াই।
বিষ্ণুপুরাণের (৬ষ্ঠ অংশ) বর্ণনা অনুযায়ী, কল্কি অবতারের অভিযানের সমান্তরালে প্রকৃতিও তার সংহার রূপ ধারণ করবে। কলিযুগের অন্তিম সময়ে টানা ১০০ বছর কোনো বৃষ্টি হবে না, ফলে এক ভয়াবহ বিশ্বজনীন খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এরপর আকাশে একই সাথে ১২টি সূর্যের (দ্বাদশ আদিত্য) উদয় হবে। এই প্রচণ্ড উত্তাপে সমুদ্রের জল শুকিয়ে যাবে এবং পৃথিবী এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে, যাকে শাস্ত্রীয় ভাষায় ‘সংবর্তক অগ্নি’ বলা হয়। এই অগ্নি যখন পৃথিবীর সমস্ত অশুচিতা দহন করবে, তখন আকাশ জুড়ে বিশাল মেঘের সঞ্চার হবে এবং শুরু হবে এক মহাপ্লাবন। গজার হাতীর শুঁড়ের মতো মোটা ধারায় বর্ষিত জলরাশি সমগ্র বিশ্বকে নিমজ্জিত করবে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এই ধ্বংসের ফলে কি হিন্দু ধর্ম বা সনাতন ঐতিহ্য মুছে যাবে? শাস্ত্রীয় উত্তর হলো—না। ধর্ম হলো শাশ্বত সত্য, যা ঈশ্বর স্বয়ং রক্ষা করেন। শ্রীমদ্ভাগবতের (১২.২.৩৭-৩৮) মতে, এই প্রলয় জলরাশির মাঝে পৃথিবী যখন শোধিত হবে, তখন সূর্যালোক আবার স্পষ্টভাবে দেখা দেবে। চন্দ্র, সূর্য এবং বৃহস্পতি যখন একই রেখায় ‘পুষ্যা’ নক্ষত্রে অবস্থান করবে, ঠিক তখনই পুনরায় ‘সত্যযুগ’ বা ‘কৃতযুগ’-এর সূচনা হবে। অর্থাৎ, ভগবান কল্কি ধর্মের বিনাশ হতে দেবেন না, বরং তিনি অধর্মের আবরণ সরিয়ে ধর্মের প্রকৃত স্বরূপকে পুনরুদ্ধার করবেন।
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী, এই মহাপ্রলয় কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং এটি একটি ‘শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া’। যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে মানুষ নতুন বস্ত্র পরিধান করে, তেমনি ঈশ্বরও পাপে কলুষিত এই পৃথিবীকে ধ্বংস করে পুনরায় নতুন করে সাজান। শাস্ত্রীয় এই প্রলয় সংকেত মূলত মানবজাতিকে সৎ পথে চলার এক আধ্যাত্মিক সতর্কতা। বিনাশের ভস্ম থেকেই জন্ম নেবে এক আলোকোজ্জ্বল নতুন পৃথিবী, যেখানে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, সত্য ও ন্যায়।

















