সাইবার ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ফাঁদে ১৩ হাজার নারীর জীবন

দেশের সাইবার স্পেসে নারীদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। গত এক বছরেই ১৩ হাজার ৮১৩ জন নারী সাইবার হয়রানির শিকার হয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) অভিযোগ জানিয়েছেন। প্রেমের অভিনয়, ভিডিও কলে আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ এবং পরবর্তীতে সেই ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়াবহ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক নারী এসব অপরাধ মুখ বুজে সহ্য করলেও, সঠিক সময়ে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ।
সম্প্রতি মধ্যবয়সী এক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আশরাফ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দীর্ঘ ছয় মাসের আলাপচারিতা এক পর্যায়ে প্রেমে রূপ নেয়। নিয়মিত মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে কথা বলার সময় স্ক্রিন রেকর্ডারের মাধ্যমে ওই নারীর অজান্তেই কিছু আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ করে রাখে আশরাফ। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। তবে ভুক্তভোগী নারী দমে না গিয়ে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’-এর ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে সিআইডি দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত আশরাফকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, মোট ৯ হাজার ১৬৫ জন নারী পুলিশের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ বা ৪ হাজার ১৩৪ জনই ডক্সিংয়ের (অনুমতিহীন তথ্য প্রকাশ) শিকার হয়েছেন। এছাড়া ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়েছেন ১৮ শতাংশ এবং আইডি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন ১৭ শতাংশ নারী। বাকিরা সাইবার বুলিং, ইমপারসোনেশন এবং আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানোর মতো অপরাধের শিকার হয়েছেন। সিআইডির তথ্যমতে, গত বছরের ১৩ হাজার ৮১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১২ হাজার ৬৩২টি অভিযোগ টেলিফোনের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
কণা (ছদ্মনাম) নামের আরেক ভুক্তভোগীর ঘটনা আরও শিউরে ওঠার মতো। তার গোসলের ছবি গোপনে ধারণ করে একটি ফেক আইডির মাধ্যমে তাকে পাঠিয়ে আরও আপত্তিকর ভিডিও এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। কণা সাহসিকতার সঙ্গে তার অভিভাবককে জানান এবং বাবার সহায়তায় থানায় অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাইবার স্পেসে অপরাধীরা একজন নারীকে সামাজিকভাবে হেয় করার মাধ্যমে তার ব্যক্তিজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। প্রচলিত সাইবার আইনে এসব অপরাধের কঠোর বিচারের সুযোগ রয়েছে, তবে ব্যবহারকারীদেরও ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদানে ও বন্ধুত্ব তৈরিতে অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন থাকা জরুরি।

















