শিক্ষাঙ্গনে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা কি তবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কেবল একটি ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশের সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে বৈষম্যহীন এবং সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের স্বপ্ন দেখেছিল, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত সেই আকাঙ্ক্ষাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
একটি সাধারণ গ্রাফিতির শব্দ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে যে মাত্রায় সহিসংতা এবং দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার আমরা দেখলাম, তা কোনোভাবেই সুস্থ ছাত্র রাজনীতির পরিচয় দেয় না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল—ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, স্বৈরাচারী ছাত্রলীগের পতনের পর সেই দখলদারিত্ব ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি অন্য নামে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তুচ্ছ অজুহাতে কিরিচ দিয়ে সহপাঠীর গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করার মতো পৈশাচিকতা প্রমাণ করে যে, নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তনের চেয়ে পেশিশক্তির দাপট এখনো ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রধান হাতিয়ার।
এই সংঘাতের রেশ এখন এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ছে। পাল্টাপাল্টি কাদা ছোড়াছুড়ি এবং মুরুব্বি সংগঠনগুলোর দায়সারা বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। যখন কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে বা ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন তাদের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এক ধরনের ‘প্রভুত্ব’ জাহির করার প্রবণতা দেখা যায়। বর্তমানে ছাত্রদলের মধ্যে সেই লক্ষণগুলো স্পষ্ট। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের কৌশলগত অবস্থান এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও উত্তজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন আতঙ্কে আছেন—একটি ‘হেলমেট-হাতুড়ি’ বাহিনীর বিদায়ের পর কি অন্য কোনো ‘দখলদার’ শক্তির কাছে তাদের জিম্মি হতে হবে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অস্ত্রের সরবরাহ। জুলাই পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ ক্যাম্পাসে এত দ্রুত আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্রের মজুদ গড়ে ওঠা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হবে নাকি অস্ত্রাগার, তা নির্ধারণের সময় এখনই। যদি এখনই এই অপসংস্কৃতি দমন করা না যায়, তবে জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে।
পরিশেষে, ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করে প্রকৃত ছাত্রত্বের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোকে বুঝতে হবে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা শিক্ষাঙ্গনে আর কোনো রক্তপাত বা সেশনজট চায় না। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে এবং অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সিটি কলেজের ঘটনাই যেন শেষ সংঘাত হয়। সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক চর্চাই হোক আগামীর পথ।
মো. মানিক হোসেন
সিনিয়র রিপোর্টার, পিপলস নিউজ ২৪
mdmanikhosen64@gmail.com

















