যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশিরাও

যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা এখন ‘মহামারি’র রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রিভপোর্ট সিটিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ পিতার হাতে নিজ ৭ সন্তানসহ ৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র আবারও সামনে এনেছে। গত ১৫ বছরে দেশটিতে ২২৭টি বড় ধরনের পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার আঁচ লেগেছে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোতেও।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ দিনে পারিবারিক সহিংসতায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে। লুইজিয়ানার ঘটনায় ঘাতক শামার এলকিনস পেশায় একজন সাবেক সেনাসদস্য ছিলেন। সন্তানদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকলেও বিষণ্নতা ও খ্যাপাটে স্বভাবের কারণে তিনি সাপ্তাহিক ছুটিতে নিজ বাড়িতেই ৪ কন্যা ও ৩ পুত্রসন্তানকে গুলি করে হত্যা করেন।
গত কয়েক বছরে অন্তত তিনটি বড় পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে:
টেক্সাস (২০২১): পাবনা বংশোদ্ভূত দুই ভাই তানভীর ও ফারহান মা-বাবা, বোন ও দাদিকে গুলি করে হত্যা করার পর নিজেরা আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে তারা লিখেছিলেন, পরিবারের প্রতি ‘ভালোবাসা’ থেকেই তাদের এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত।
স্যান হোজে, ক্যালিফোর্নিয়া: প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী ও শামীমা দম্পতিকে তাদের বড় ছেলে হাসিব সমকামিতা ও জীবনযাপন নিয়ে বিরোধের জেরে গুলি করে হত্যা করেন। বিচারে হাসিবের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে।
অ্যারিজোনা (২০২৫): গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৯ বছরের দাম্পত্য কলহের জেরে আবুল আহসান হাবিব তার স্ত্রী সোহেলি আখতারকে গুলি করে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেন।
সমাজ গবেষক ও মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের এই প্রবণতা কমানোর সহজ কোনো উপায় নেই। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির নিওরো-সাইকোলজির প্রফেসর রবার্ট হ্যানলন বলেন, “ধনী দেশগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এই সংকটের অন্যতম কারণ। মাদকাসক্তি, অবসাদ ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা যখন আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন আপনজনরাই ঘাতক হয়ে ওঠেন।”
বিশেষজ্ঞরা একে ‘পেশাদারি কায়দায় ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঘাতক পিতা বা স্বামী বাইরে স্বাভাবিক আচরণ করলেও ভেতরে ভেতরে ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা পোষণ করেন, যা পরিবারের অন্য সদস্যদের পক্ষে টের পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ৩৪ কোটি মানুষের বিপরীতে আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ব্যাপক। গড়ে প্রতিদিন ১৩০ জন মানুষ বন্দুক সহিংসতায় প্রাণ হারান এবং বছরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৭ হাজারে। প্রতিবার বড় কোনো হত্যাকাণ্ডের পর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠলেও কার্যকর কোনো সমাধান আজও মেলেনি।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অভিবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ পূরণের লড়াইয়ে সফল হলেও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা তাদের পরিবারগুলোকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

















