নিভে গেল সুরের আকাশের ধ্রুবতারা

সাত দশকের সুর-সাধনা আর হাজার হাজার গানের মায়াবী আবেশে বিশ্ববাসীকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা সেই অবিনশ্বর কণ্ঠস্বর আজ স্তব্ধ। ভারতীয় সঙ্গীতের অনন্য সাধারণ প্রতিভা, সুরের জাদুকরী আশা ভোসলে পরলোকগমন করেছেন।
রবিবার দুপুরে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহীয়সী শিল্পী। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতাকাশের এক স্বর্ণালি নক্ষত্র যেন চিরতরে মহাকালে লীন হলো।
শনিবার সন্ধ্যা থেকেই শিল্পীর অসুস্থতার খবরে প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন অগণিত অনুরাগী। হৃদরোগ এবং ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রথিতযশা চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন তিনি। তবে অগণিত মানুষের ভালোবাসা আর প্রার্থনাকে সিক্ত করে রবিবার দুপুরে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণে সুরের মায়াজাল ছিন্ন করে অনন্তলোকে যাত্রা করেন এই সুরসম্রাজ্ঞী। তাঁর পুত্র আনন্দ ভোসলে জানিয়েছেন, সোমবার বিকেল ৪টেয় মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই কিংবদন্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
আশা ভোসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন কয়েক প্রজন্মের ধ্রুবতারা। ধ্রুপদী রাগাশ্রয়ী গান থেকে শুরু করে আধুনিক পপ কিংবা বিষণ্ণ গজল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুম নে’ থেকে শুরু করে ‘ইন আঁখো কী মস্তি’, তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি চিরকাল অম্লান থাকবে। বাংলা গানেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; তাঁর গাওয়া কালজয়ী বাংলা গানগুলো আজও বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন নিয়ে আছে।
এই মহান নক্ষত্রপাতে শোকস্তব্ধ গোটা বিশ্ব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, “প্রজন্মের পর প্রজন্ম তিনি আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। তাঁর প্রয়াণ এক অপূরণীয় ক্ষতি।” ২০১৮ সালে তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল, যা বাঙালির পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি এক বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
দাদাসাহেব ফালকে, পদ্মবিভূষণ এবং অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী এই শিল্পী তাঁর কর্মের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন। ৯২ বছরের এই দীর্ঘ জীবনযাত্রায় তিনি শিখিয়ে গিয়েছেন কীভাবে সুরের মাধ্যমে সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠতে হয়।
সুরের আকাশের ধ্রুবতারাটি হয়তো আজ আমাদের চর্মচক্ষুর আড়ালে চলে গেল, কিন্তু তাঁর সুরের জ্যোতি অনন্তকাল ধরে সঙ্গীতপ্রেমীদের পথ দেখাবে। বিদায় সুরসম্রাজ্ঞী, আপনার সৃষ্টি কোনোদিন ম্লান হবে না।

















