চাঁদকে বিদায় বলে পৃথিবীতে ফিরছেন চার নভোচারী

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে ৪ নভোচারীকে নিয়ে ফিরছে আর্টেমিস-২। মঙ্গলবার বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের ফেরার যাত্রায় প্রায় চার দিন সময় লাগবে।
আগামী ১০ এপ্রিল স্থানীয় সময় রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের প্যাসিফিক মহাসাগরে অবতরণ করবে মহাকাশযানটি। এরপর হেলিকপ্টারে মহাকাশচারীদের পানি থেকে তুলে নিকটবর্তী মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে পৌঁছে দেওয়া হবে। নাসা জানিয়েছে, জাহাজে অবস্থানকালে তাদের মেডিকেল চেকআপ করা হবে।
এই যাত্রাপথে পৃথিবী থেকে মানুষের মহাকাশে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড গড়েছেন তারা। চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা অন্ধকার অংশ প্রদক্ষিণ করার সময় সেই দৃশ্য দেখেছেন তারা, যা আগে কখনো কেউ দেখেনি।
নাসা বলছে, চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসতে মিশনের ওরিয়ন ক্যাপসুলের সাত ঘণ্টার মত সময় লেগেছে। এ সময় চাঁদের দূরবর্তী অংশের ছবিও ধারণ করা হয়েছে।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো–১৭ মিশনের পর মানবজাতির প্রথম চাঁদে প্রত্যাবর্তনের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এবারের অভিযান। নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যানের নেতৃত্বে এই মিশনে আছেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন।
তাদের ক্যাপসুল চাঁদের উল্টো পাশে গেলে পৃথিবী ও মহাকাশযানের সাথে রেডিও সিগনাল যাতায়াত করতে না পারায় প্রায় ৪০ মিনিট নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল।
সেই সময়টা পেরিয়ে আসার পর নভোচারীরা তাদের অভিজ্ঞতার গল্প নাসার মিশন কন্ট্রোল রুমে অপেক্ষায় থাকা বিজ্ঞানীদের শোনান।
মিশন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেন, তারা যা দেখছেন তা বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন।
‘জানি, আমাদের এই পর্যবেক্ষণ হয়ত বৈজ্ঞানিকভাবে তেমন মূল্যবান নয়, কিন্তু আমি খুশি, ভাগ্যিস আমরা ১ এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিলাম! আমরা আজ যা দেখেছি, মানুষ সম্ভবত এমন দৃশ্য দেখার জন্য এখনও বিবর্তিত হয়নি’ বলেন ভিক্টর।
মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান বলেন, ‘এ অভিজ্ঞতা বর্ণনাতীত। যতক্ষণই আমরা তাকিয়ে থাকি না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক ওই দৃশ্য পুরোপুরি তৈরি করতে পারছে না। এটা অসাধারণ, পরাবাস্তব… এটা বোঝাতে কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়—আমাকে নতুন শব্দ বানাতে হবে, জানালার বাইরে আমরা যা দেখছি, তা বোঝানোর মতো শব্দ নেই।’
চাঁদের দূরতম অংশ পর্যবেক্ষণের পর্ব শেষ হওয়ার পর মিশনের লাইভ সম্প্রচারে যোগ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আর্টেমিস টুর নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা যা করছেন, এর মত কিছু মানুষ আগে কখনও দেখেনি। এটা সত্যিই অতুলনীয়।’
ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন, হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? জবাবে ভিক্টর গ্লোভার বলেন, তিনি একটু প্রার্থনা করেছিলেন, এরপর চাঁদের দূরবর্তী অংশের বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহে মন দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে খুব ব্যস্ত ছিলাম, বেশ চাপ গেছে। তবে বলতে হয়, অভিজ্ঞতাটা আসলে বেশ ভালোই ছিল।’
আলাপকালে পৃথিবীতে ফেরার পর মিশনের চার নভোচারীকে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার দাওয়াত দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ঐতিহাসিক মিশন শেষে ফিরছেন নভোচারীরা
গত সপ্তাহে ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণের পর থেকে আর্টেমিস-টু এর নভোচারীরা নিজেদের ওরিয়ন ক্যাপসুলে অবস্থান করছেন। বহু বিলিয়ন ডলারের এ সিরিজ মিশনের লক্ষ্য চীনকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে নভোচারীদের পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া এবং আগামী দশকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
এছাড়া চাঁদে একটি ঘাঁটি তৈরি করতে চায় নাসা, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে সম্ভাব্য মিশনের প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে কাজ করবে। অভিযানের ষষ্ঠ দিনে যুক্তরাষ্ট্র সময় সোমবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘুম থেকে ওঠার পর তাদের শোনানো হয় অ্যাপোলো ৮ ও ১৩ মিশনের প্রয়াত নভোচারী জিম লোভেলের রেকর্ড করা এক বার্তা।
গত বছর ৯৭ বছর বয়সে মারা যাওয়া লোভেল জানতেন, মহাকাশে সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ভ্রমণের তাদের রেকর্ডটি এবার ভাঙতে যাচ্ছে আর্টেমিস- টু মিশন।
এই মিশনের নভোচারীদের উদ্দেশে তিনি সেই বার্তায় বলে গেছেন, ‘আমার পুরানো এলাকায় তোমাদের স্বাগতম! ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান, বিল অ্যান্ডার্স আর আমি যখন অ্যাপোলো ৮-এ করে চাঁদ প্রদক্ষিণ করেছিলাম, তখন মানবজাতি প্রথমবার কাছ থেকে চাঁদকে দেখেছিল। পুরো পৃথিবীর এমন এক দৃশ্য পেয়েছিল, যা বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আজ আমি গর্বের সঙ্গে সেই মশাল তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। তোমরা চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে মঙ্গলে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করছো। এ ঐতিহাসিক দিন, তোমরা অনেক ব্যস্ত থাকবে জানি। তবে ওই দৃশ্য উপভোগ করতে ভুলো না। তোমাদের সবার জন্য শুভকামনা।’
বার্তাটি শোনার পর আর্টেমিস- টু’র কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান মিশন কন্ট্রোলে রেডিওর মাধ্যমে বলেন, ‘জিম লোভেলের বার্তাটি অসাধারণ ছিল। তার কণ্ঠে আমাদের স্বাগত জানানো শুনতে খুব ভালো লেগেছে।’
এরপর যুক্তরাষ্ট্র সময় দুপুর ১টা ৫৬ মিনিটে পৃথিবী থেকে মানুষের সর্বোচ্চ দূরত্বে ভ্রমণের রেকর্ড গড়েন আর্টেমিস- টু মিশনের নভোচারীরা। এর আগে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো–১৩ মিশনের নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরত্ব পেরিয়েছিলেন।
সেই দূরত্ব পেরিয়ে আরো প্রায় ৪ হাজার ১০২ মাইল এগিয়ে গিয়ে পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল দূরত্বে পৌঁছানোর নতুন রেকর্ড গড়ে পৃথিবীর পথ ধরেছেন এবারের অভিযানের চার নভোচারী।

















